সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি সুপরিসর নগর উদ্যান। এটি পূর্বে রমনা রেস কোর্স ময়দান নামে পরিচিত ছিল। এক সময় ঢাকায় অবস্থিত ব্রিটিশ সৈন্যদের সামরিক ক্লাব এখানে প্রতিষ্ঠিত ছিল। পরবর্তীতে এটি রমনা রেস কোর্স এবং তারপর রমনা জিমখানা হিসাবে ডাকা হত। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পর মাঠটিকে কখনও কখনও ঢাকা রেস কোর্স নামে ডাকা হত এবং প্রতি রবিবার বৈধ ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হত। একটি জাতীয় স্মৃতিচিহ্নও বটে কেননা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চের ভাষণ এখানেই প্রদান করেন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই ডিসেম্বার পাকিস্তান সেনাবাহিনী এই উদ্যানেই আত্মসমর্পণ করে মিত্রবাহিনীর কাছে। রেস কোর্স ময়দানের অদূরে অবস্থিত তৎকালীন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পনের স্থান হিসেবে প্রথমে নির্ধারণ করা হলেও পরবর্তীতে আত্মসমর্পনের জন্য এই মাঠটি নির্বাচন করা হয়।
অবস্থান
রমনা রেসকোর্সের দক্ষিণে পুরানো হাইকোর্ট ভবন, তিন জাতীয় নেতা শেরে-বাংলা এ. কে ফজলুল হক, খাজা নাজিমুদ্দিন এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সমাধি; পশ্চিমে বাংলা একাডেমী, অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র, চারুকলা ইনস্টিটিউট, বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ, পাবলিক লাইবে্ররি এবং বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর; উত্তরে বারডেম হাসপাতাল, ঢাকা ক্লাব ও ঢাকার টেনিস কমপ্লেক্স এবং পূর্বে সুপ্রীম কোর্ট ভবন, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট ও রমনা পার্ক।
প্রাথমিক ইতিহাস
তখন পশ্চিমে আজিমপুর, নিউমার্কেট ও ধানমন্ডি, দক্ষিণে বর্তমান সচিবালয় ভবন, কার্জন হল, চাঁনখার পুল ও পূর্বে পুরানা পল্টন, সেগুনবাগিচা, ও রাজারবাগ আর উত্তরে সেন্ট্রাল রোড, পরিবাগ ও ইস্কাটন পর্যন্ত এলাকাটি বিস্তৃত ছিল। ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানি শাসনামলে ঢাকার চারটি থানার একটির নামকরণ করা হয়েছিল রমনা। বর্তমানেও ঢাকার ২০টি থানার একটি হচ্ছে রমনা।
রমনার ইতিহাস শুরু হয় ইংরেজি ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে যখন মুগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে সুবাহদার ইসলাম খান ঢাকা নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। ঐ সময় ঢাকার উত্তর শহরতলিতে দুটি চমৎকার আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠে। সুবাহদার ইসলাম খান চিশতির ভাইয়ের নামানুসারে এর একটির নামকরণ করা হয় মহল্লা চিশতিয়া এবং সুবাহদার ইসলাম খানের একজন সেনাধ্যক্ষ সুজা খানের নামানুসারে অপর এলাকাটির নামকরণ হয় মহল্লা সুজাতপুর। এই এলাকায় তখন উন্নত বসতবাড়ি ছাড়াও মসজিদ, বাগান, সমাধিসৌধ, মন্দির ইত্যাদি গড়ে ওঠে। মুগল সাম্রাজের পতনের পর রমনা ধীরে ধীরে তার পুরানো গৌরব হারিয়ে ফেলে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে সরকারি কাগজপত্রে রমনার নাম তেমন একটা চোখে পড়ে না। বস্তুত ঐ সময় রমনা ছিল একটি জঙ্গলাকীর্ণ পরিত্যক্ত এলাকা যেখানে ধ্বংসপ্রাপ্ত দালানকোঠা, মন্দির, সমাধি ইত্যাদি ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল।
ব্রিটিশ আমল
১৮২৫ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার ব্রিটিশ কালেক্টর মি. ডয়েস ঢাকা নগরীর উন্নয়নকল্পে কতগুলি বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং তখন থেকেই ঢাকা আবার তার পুরানো গৌরব ফিরে পেতে শুরু করে। ঐ সময় কালেক্টর ডয়েস কালী মন্দির ছাড়া অন্যান্য বেশির ভাগ পুরানো স্থাপনা সরিয়ে ফেলেন এবং জঙ্গল পরিষ্পার করে রমনাকে একটি পরিচ্ছন্ন এলাকার রূপ দেন। পুরানো হাইকোর্ট ভবনের পশ্চিমে বর্তমানে অবস্থিত মসজিদ এবং সমাধিগুলি তিনি অক্ষত রাখেন। পুরো এলাকাটি পরিষ্পার করে তিনি এর নাম দেন রমনা গ্রীন এবং এলাকাটিকে রেসকোর্স হিসেবে ব্যবহারের জন্য কাঠের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলেন। রমনা রেসকোর্সের মধ্যখানে একটি কালী মন্দির ছিল। এটি ছিল দশনামী গোত্রের হিন্দুদের কালী মন্দির। মনে করা হয় যে, নেপাল থেকে আগত দেবী কালীর একজন ভক্ত এই মন্দির নির্মাণ করেন। ঢাকা শহরের অন্যতম পুরানো এবং বনেদি এই কালী মন্দিরটি পরে ভাওয়ালের রানী বিলাসমণি দেবী সংস্কার ও উন্নয়ন করেন।
নাজির হোসেন কিংবদন্তির ঢাকা গ্রন্থে লিখেছেন, "ব্রিটিশ আমলে রমনা ময়দানটি ঘোড়দৌড়ের জন্য বিখ্যাত ছিল। প্রতি শনিবার হতো ঘোড়দৌড়। এটা ছিল একই সঙ্গে ব্রিটিশ শাসক ও সর্বস্তরের মানুষের চিত্তবিনোদনের একটি স্থান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. শরীফ উদ্দিন আহমেদের এক বিবরণ থেকে জানা যায়, চার্লস ডজ রমনায় রেসকোর্স বা ঘোড়দৌড়ের মাঠ নির্মাণ করেন। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ঢাকার খ্যাতনামা আলেম মুফতি দীন মহম্মদ এক মাহফিল থেকে ঘৌড়দৌড়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। এ কারণে সরকার ১৯৪৯ সালে ঘৌড়দৌড় বন্ধ করে দেয়।
ঢাকার নওয়াবদের আনুকূল্যে একসময় ঘোড়দৌড় ঢাকায় খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ছাত্রাবাস মহসীন হলের উত্তরপাশে নওয়াবদের ঘোড়ার আস্তাবল কিছুদিন আগেও ছিল অক্ষত। ঢাকার নওয়াবগণ রেসকোর্স এলাকাটির উন্নয়ন সাধন করেন এবং এলাকায় একটি সুন্দর বাগান তৈরি করে তার নাম দেন শাহবাগ বা রাজকীয় বাগান। নওয়াবগণ এলাকাতে একটি চিড়িয়াখানাও স্থাপন করেছিলেন। ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে রেসকোর্সের উত্তর কোণে ব্রিটিশ আমলারা ঢাকা ক্লাব স্থাপন করেন। পরে ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের শাসনামলে বঙ্গভঙ্গের সময় পূর্ববঙ্গ ও আসাম নিয়ে নবগঠিত প্রদেশের গভর্নরের সরকারি বাসভবন স্থাপনের জন্যও রমনা এলাকাকে নির্বাচন করা হয়। এই গভর্নমেন্ট হাউজ পরে হাইকোর্ট ভবনে (পুরাতন) রূপান্তরিত হয়। গভর্নমেন্ট হাউজের পাশে মিন্টো রোড এলাকায় পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা এবং হাইকোর্টের বিচারকদের বসবাসের জন্য বেশ কিছু সুন্দর ও উন্নতমানের ভবন তৈরি করা হয়। বৃহত্তর রমনা এলাকায় ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে এলাকাটির গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়।
পাকিস্থান আমল
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পরও রমনা ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবেই থেকে যায়। শাহবাগ থেকে ইডেন বিল্ডিং (সচিবালয়) পর্যন্ত নতুন একটি রাস্তা করা হয় এবং এই রাস্তার পূর্বদিকের অংশে রমনা পার্ক নামে একটি চমৎকার বাগান গড়ে তোলা হয়। বর্তমানের সুপ্রীম কোর্ট ভবনের উত্তর-পূর্ব কোণের চিড়িয়াখানাটি তখনও বিদ্যমান ছিল। তবে চিড়িয়াখানার প্রাণীদের মধ্যে ছিল শুধু গুটিকয়েক বাঘ, ভালুক এবং বিভিন্ন জাতের কিছু পাখি। পরে চিড়িয়াখানাটি মীরপুরে তার বর্তমান অবস্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেল থেকে মুক্তি পেলে রমনা রেসকোর্সে তাঁকে এক নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া এবং এখানেই তাঁকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ রমনা রেসকোর্সে এক মহাসমাবেশের আয়োজন করে এবং এই সমাবেশে জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সদস্যগণ প্রকাশ্যভাবে জনসভায় শপথ গ্রহণ করেন যে, কোন অবস্থাতেই এমনকি পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের চাপের মুখেও তাঁরা বাংলার মানুষের স্বার্থের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ আবার এই রমনাতে এক মহাসমাবেশে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন এবং ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এই ঘোষণার মাধ্যমে কার্যত দেশের স্বাধীনতাই ঘোষণা করেন। ৯ মাস বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে এবং রমনা মাঠেই (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সৈন্যগণ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। এই দিনটি বাংলাদেশের বিজয় দিবস। এই ঘটনার পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ তারিখে অনুষ্ঠিত এক বিরাট জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বক্তব্য রাখেন। এ সময় থেকে রমনা রেসকোর্স গুরুত্বপূর্ণ ও রাজনৈতিক সমাবেশের স্থানে পরিণত হয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা কালী মন্দির সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয়।
খোলা-বন্ধের সময়সূচী
সপ্তাহের প্রতিদিন ভোর ৬ টা থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে এই উদ্যান। এই উদ্যানে প্রবেশ করতে কোন প্রকার চার্জ দিতে হয় না। এছাড়া রাত দশটার পর উদ্যানে থাকা নিরাপদ নয়।
সময়ের সাথে পরিবর্তন
ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রতিষ্ঠার পর থেকে যেসব পরিবর্তন সাধিত হয়েছে তা নিম্নরুপ-
ক) ১৬১০ সালে ঢাকার নবাবগণ রমনা এলাকায় এ সুদৃশ্য উদ্যানের সূচনা করেন।
খ) ১৬১০ থেকে ১৮২৪ সাল পর্যন্ত এর নাম ছিল বাগ-ই-বাদশাহী বা বাদশাহী বাগান।
গ) ১৯২৫ সালে এ স্থানটি ঘোড়দৌড়ের জন্য বিখ্যাত ছিল তাই এর নাম হয় রেসকোর্স ময়দান
ইতিহাসের সাক্ষী
ক) ১৯৪৮ সালে ২১ মার্চ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এ উদ্যানে/ ময়দানে ঘোষনা করেন উর্দূই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।
খ) ১৯৬৯ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে এখানে “বঙ্গবন্ধু” উপাধি দেওয়া হয়।
গ) ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান এই উদ্যানের মাঠেই ঐতিহাসিক ভাষন দেন “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”।
ঘ) ১৯৭১ সালের ২৫,২৬ ও ২৭ শে মার্চ এ উদ্যানের ভিতরে অবস্থিত। কালী মন্দির ও আনন্দময়ী আশ্রমের সন্ন্যাসী ও অধিবাসীরা গনহত্যার শিকার হন ও মন্দিরের আশ্রম ধ্বংশ করা হয়।
ঙ) ১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর এই ঐতিহাসিক ও ময়দানেই পাক বাহিনী ৯৩,০০০ হাজার সৈন্য নিয়ে যৌথবাহিনীর কাছে লিখত ভাবে আত্মসমর্পন করেন। পাক বাহিনীর পক্ষে আনুষ্ঠানিক ভাবে আত্ম সমর্পনের দলিলে স্বাক্ষর করেন জেনারেল নিয়াজী।
চ) ১৯৭১ সালে এই উদ্যানটির নামকরন করা হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান।
ছ) ১৯৯৭ সালে এখানে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এখানে শিখা চিরন্তন স্থাপন করা হয়।
জ) ১৯৯৯ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্মৃতি জাদুঘর নির্মান কাজ শুরু করা হয়।
বর্তমান অবস্থা
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বর্তমানে নানা রকম সংস্কার কাজ চলছে তম্মধ্যে উদ্যানের স্বাধীনতা স্মৃতি জাদুঘর, স্বাধীনতা মঞ্চ, শ্রী শ্রী রমনা কালী মন্দির ও আমন্দময়ী আশ্রম পূনঃ সংস্কার, দিঘি সংস্কার, রাস্তা, মূল ফটক সংস্কার কাজ হাতে নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
প্রবেশ ও বাহির
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মূল প্রবেশ পথ ছয়টি। যেমন-
ক) ইঞ্জিনিয়ারিং ইনষ্টিটিউশন সংলগ্ন গেইট।
খ) শিশু পার্ক ও শিখা চিরন্তন সংলগ্ন গেইট।
গ) চারুকলা ইনষ্টিটিউটের বিপরীতে অবস্থিত গেইট।
ঘ) টি.এস.সি সংলগ্ন গেইট।
ঙ) শ্রী শ্রী মা কালী আনন্দময়ী আশ্রম সংলগ্ন গেইট।
চ) বাংলা একাডেমীর বিপরীত ও তিন নেতার মাজার সংলগ্ন গেইট।
বেশী ভিড়
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সাধারণত ছুটির দিনগুলোতে বেশী ভিড় লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া ঈদ,পূজা ও পহেলা বৈশাখ, নববর্ষ ইত্যাদি বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে প্রচুর ভীড় হয়।
পার্কের প্রাঙ্গন সমূহ
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পুরো অংশটিতে বিভিন্ন প্রাঙ্গন আছে। এখানে সব ধরনের মানুষ বেড়াতে আসে। পার্কের প্রত্যেকটি প্রাঙ্গনের বিশেষত্ব আছে। প্রাঙ্গনগুলো হল- বৃক্ষছায়া, বৃক্ষমায়া, বটতলা, চারু অঙ্গন, শিখা চিরন্তনি, আনন্দময়ী অঙ্গন, দীঘির পাড়, লালন চর্চা অঙ্গন, জাদুঘর অঙ্গন, লেক ভিউ, শতায়ু অঙ্গন।
পার্কে প্রাপ্ত দূর্লভ ও সাধারণ বৃক্ষ সমূহ
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মূলত ঢাকার নবাবদের বাগান ছিল। ঢাকা পূর্ববঙ্গের রাজধানী হওয়ায় ঢাকার নবাবগণ রমনা এলকায় এই সুদৃশ্য উদ্যানের সূচনা করেন। এখানে সাধারন বৃক্ষ ছাড়াও দূর্লভ প্রজাতির গাছ শোভাবর্ধক গাছও আছে। পার্কে দূর্লভ বৃক্ষসমূহের মধ্যে অন্যতম হল- শিমুল, কড়াই, বট, মেহগনি, অর্জুন, গর্জন, গেওয়া, আমলকি, তেতুঁল, হরিতকি, নিম গাছ, বেল গাছ, কদম ও বহেরা ইত্যাদি ছাড়াও কাঁঠালচাপা, কৃষ্ণচূড়া শোভাবর্ধক ফুল গাছ এবং অন্যান্য সাধারণ বৃক্ষতো আছেই।
ফুড কর্ণার ও রেস্তোরা
পার্কে স্থায়ী কোন রেষ্টুরেন্ট নেই। রয়েছে ভ্রাম্যমান কিছু খাবারের দোকান। এই দোকানগুলোর মধ্যে রয়েছে সাধারন ফাষ্টফুড জাতীয় দোকান, পিঠার দোকান, দই ও মিষ্টির দোকান, চা, বিস্কুট, কলা ও অন্যান্য দোকান, কোমল পানীয় ও কফি শপ এবং চটপটি ও ফুচকা।
উদ্যানের বিভিন্ন স্থাপনা
১৯৭৫ সালের পর এলাকাটিকে সবুজে ঘেরা পার্কে পরিণত করা হয়। পার্কের একপাশে শিশুদের জন্য একটি বিনোদন কেন্দ্র তথা পার্ক গড়ে তোলা হয়। এখানে শিশুদের জন্য নানা ধরনের আকর্ষণীয় খেলাধুলা, খাবার রেস্তোরঁা এবং ছোটখাটো স্মারক জিনিসপত্র ক্রয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংক্রান্ত যেসব ঐতিহাসিক ঘটনা অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলিকে স্মরণীয় করে রাখার লক্ষ্যে ১৯৯৯ সালে এখানে ‘শিখা চিরন্তন’ স্থাপন করা হয়েছে এবং একইসাথে তার পাশেই যেখানে পাকিস্তানি সেনাগণ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেছিল সেখানে গড়ে তোলা হচ্ছে স্বাধীনতা টাওয়ার।
১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দেআওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে এখানে স্বাধীনতা স্তম্ভ ও শিখা চিরন্তন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। স্বাধীনতা স্তম্ভ প্রকল্পের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ জনতার দেয়াল নামে ২৭৩ ফুট দীর্ঘ একটি ম্যুরাল বা দেয়ালচিত্র। এটি ইতিহাসভিত্তিক টেরাকোটার পৃথিবীর দীর্ঘতম ম্যুরাল। এর বিষয়বস্তু ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস। এ ছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে খনন করা হয়েছে একটি কৃত্রিম জলাশয় বা লেক। ২০০১ খ্রিস্টাব্দে চারদলীয় জোট সরকার-এর শাসনামলে আমলে উদ্যানের ভেতর ঢাকা জেলার শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা সংবলিত একটি স্থাপনা তৈরি করা হয়।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সার্বিক নিরাপত্তা ও এর রক্ষনাবেক্ষনের জন্য নিরাপত্তা প্রহরী ও পুলিশ সদস্য নিয়োজিত আছেন। কোন রকম আপ্রীতিকর সমস্যা যেন না হয় সেজন্য সর্বদা টহলরত অবস্থায় থাকেন।
হকার ও বিক্রিত দ্রব্যাদি
উদ্যানে অসংখ্য হকারের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়। এসকল হকাররা ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের কাছে খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য উপকরন বিক্রি করে থাকে। বিক্রিত দ্রব্যদিগুলো হলো আইসক্রিম, চা-কফি, বাদাম, ঝালমুড়ি, ফুল ও মালা, পপকর্ন, আমড়া, আচার, পাপড় ভাজা, চকলেট মিমি, বাচ্চাদের খেলনা সামগ্রী এবং চানাচুর ভাজা।
বিব্রতকর পরিস্থিতি
দর্শনার্থী তথা সর্বসাধারনের জন্য উম্মুক্ত হওয়ায় এখানে সাধারণত নানা রকম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরতে পারেন। যেমন- ভিক্ষুক ও সাধারন পকেটমার, বেদেনি, পথশিশু ও কুকুর। এছাড়া এখানে তেমন কোন সমস্যা নেই।
তত্ত্বাবধায়নকারী কর্তৃপক্ষ
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানটির সার্বিক তত্ত্বাবধায়ন তথা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালন করে বন ও পরিবেশ অধিদপ্তর এবং ঢাকা সিটি কর্পোরেশন।
গাড়ি পার্কিং
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নির্দিষ্ট কোন পার্কিং ব্যবস্থা নেই। তবে ভেতরে গাড়ি প্রবেশ করানো যায়। এজন্য কোন পার্কিং চার্জ নেই।
ফ্লাড লাইট ও বসার স্থান
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান রাত ১০ টা পর্যন্ত সন্ধ্যাকালীন ভ্রমনকালীন ও দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। তাই এখানে পর্যাপ্ত আলোর জন্য ফ্লাড লাইট ও স্পট লাইট সহ অন্যান্য লাইটের ব্যবস্থা আছে। এছাড়া পুরো উদ্যানে বসার জন্য পাকা বেঞ্চের ব্যবস্থা আছে। এবং নির্দিষ্ট দুরত্ব পরপর ছাউনী আছে। এছাড়া পুরো উদ্যানে কয়েকস্তরে ওয়াকওয়ে আছে।
সতর্কতা ও নিয়মাবলী
ক) রাত ১০ টার পর উদ্যানে প্রবেশ নিষেধ।
খ) উদ্যানে অসামাজিক কার্যকলাপ দন্ডনীয় অপরাধ।
গ) ভেতরে ধুমপান মুক্ত এলাকা। ধুমপান নিশেধ।
ঘ) গাছের পাতা ও ফুল ছেঁড়া নিষেধ।
ঙ) লেকের পানি ময়লা ফেলবেন না।
চ) নির্দিষ্ট ওয়াকওয়ে দিয়ে হাঁটু্ন।
স্বাস্থ্য সেবা
প্রাতঃ ও বৈকাল ভ্রমনকারী তথা সাধারণ দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে এখানে ভ্রাম্যমান স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম এর ব্যবস্থা আছে। এজন্য নির্দিষ্ট হারে খরচ পড়বে। স্বাস্থ্য সেবা সমূহ- রক্ত পরীক্ষা, প্রেসার মাপা, ওজন মাপা, ডায়াবেটিস পরীক্ষা এবং উচ্চতা মাপা। প্রতিদিন বিকাল ৪ টার পর উদ্যানে এ স্বাস্থ্য সেবা সুবিধা পাওয়া যাবে।সাম্পতিক ঘটনাবলী ১। অপরাধ অপকর্ম ও অশ্লীলতার স্বর্গরাজ্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ২। অরক্ষিত সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ৩। ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ছারখার : সন্ধ্যার পর অন্য জগতে পরিণত ৪। ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মাদকের আখড়া! তথ্যসূত্র ১। উইকিপিডিয়া ২। www.online-dhaka.com ৩। গুগল










